অ্যালার্জি একটি প্রচলিত সমস্যা। বিভিন্ন কারণে অ্যালার্জি হয়। এই সমস্যা কাদের বেশি হয় এবং এর চিকিৎসা কী, সেটা নিয়ে বেসরকারি টিভি চ্যানেলে কথা বলেছেন বিশিষ্ট অ্যালার্জি বিশেষজ্ঞ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের অ্যালার্জি অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল ইমিউনোলজি বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ্চন্দ্র দাস।
প্রশ্ন : অ্যালার্জি ব্যাপক একটি বিষয়। তবে মূলত অ্যালার্জি বলতে আমরা ত্বকের অ্যালার্জিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকি। একজন মানুষের ত্বকে অ্যালার্জি হয় কেন?

উত্তর : ত্বকে যেই অ্যালার্জি হয় একে সাধারণত বলি আর্টিকেরিয়া। শরীর চাক চাক হয়ে যায়, লাল হয়ে যায়। আবার অনেক সময় ছোট বাচ্চাদের হয়, লাল হয়ে যায়, চুলকায়- একে বলে এটোপিক ডার্মাটাইটিস। বড়দের অনেক সময় হয় কনট্রাক্ট ডার্মাটাইটিস। কোনো কোনো স্পর্শে অ্যালার্জি হয়- এগুলো হয় ত্বকে। নাকের মধ্যে যে অ্যালার্জি হয় নাক চুলকায়, নাক দিয়ে পানি পড়ে, হাঁচি হয়, অনবরত হাঁচি, একে বলা হয়, অ্যালার্জি রাইনাইটিস।

আর ফুসফুসের মধ্যে যখন অ্যালার্জি হয়, শ্বাসকষ্ট হয়, কাশি হয়, রাতে ঘুমাতে পারে না। এই সবইঅ্যালার্জির বিভিন্ন রকম প্রকাশ।

প্রশ্ন : এই অ্যালার্জির কারণ কী? এটি হয় কেন?

উত্তর : আপনি ঠিকই বলেছেন, একটি পরিবারে হয়তো পাঁচটি ভাই আছে। একজন বা দুজনের অ্যালার্জি হবে আর তিনজনের হবে না। সাধারণত যাদের রক্তে আইজিইর পরিমাণ বেশি, তাদের সাধারণত অ্যালার্জি হয়।

কতগুলো সাবসট্যান্স থাকে যেগুলো অ্যালার্জির জন্য সহায়ক। সবচেয়ে বেশি অ্যালার্জির জন্য সহায়ক হলো ধুলাবালি, বাড়ি ঘরের বিছানাপত্র। এসবের মধ্যে এক ধরনের পোকা থাকে। এই ধরনের পোকা একটি তোশকের মধ্যে প্রায় ২০ লাখের বেশি থাকে। একে হাউজ ডাস্ট মাইট বলে। তা ছাড়া ফুলের রেণু, ফাঙ্গাস, কোনো খাদ্য, পশু পাখির লোম- এগুলো থেকেও অ্যালার্জি হতে পারে। তবে একেকজনের একেকটি বিষয় থেকে অ্যালার্জি হতে পারে।

প্রশ্ন : তাহলে এই অ্যালার্জি থেকে বাঁচার উপায় কী?

উত্তর : আমাদের লেপ তোশক ব্যবহার করতেই হয়। আমি সবাইকে বলি, যে তোশকে আমরা ঘুমাই এগুলো মাঝে মাঝে রোদ্রে দেওয়া উচিত। বিশেষত বিছানার চাদরটি প্রতিদিন তো ধোয়া সম্ভব নয়, একে প্রতিদিন রোদে শুকাতে দেওয়া উচিত। আর বিদেশে বা বাংলাদেশেও এখন মাইটরোধী কাভার পাওয়া যায়। এই কভারগুলো যদি আমরা তোশকের ওপর দেই বা বালিশের ওপর দেই ভেতর থেকে মাইটটা আসবে না। এতে আমাদের কষ্ট অনেকটা লাঘব হবে।

আসলে সবারই একটি অ্যালার্জি পরীক্ষা করানো উচিত। কার কিসে অ্যালার্জি। কারো মাইটে অ্যালার্জি হয়, কারো ফাঙ্গাল অ্যালার্জি হয়। আমাদের একটি সাধারণ ধারণা অ্যাজমা হয়েছে, গরুর মাংস, চিংড়ি , বোয়াল মাছ, গজার মাছ সব খাওয়া বাদ দিতে হবে। তবে এগুলো ঠিক নয়। আমার ২০ বছরের অভিজ্ঞতায় দেখেছি শতকরা ৯৮ শতাংশ রোগীরই গরুর মাংসে অ্যালার্জি হয় না। গরুর মাংস খেলেও যা, না খেলেও তা। তাই অ্যাজমা হয়েছে দেখে গরুর মাংস, চিংড়ি খাওয়া যাবে না, সেটি ঠিক নয়। প্রথমে একটি অ্যালার্জির পরীক্ষা করতে হবে। অ্যালার্জি পরীক্ষা করে যে এলার্জেন পাওয়া যায় সেটিকে শুধু এড়িয়ে যেতে হবে।

প্রশ্ন : অ্যালার্জির কোনো চিকিৎসা আছে কি? ধরুন আমি পরিমিত খাব, তবে সবই খেতে চাই। আবার অ্যালার্জি মুক্তও থাকতে চাই। এটি সম্ভব কি না?

উত্তর : এটি সম্ভব। অ্যালার্জির টেস্ট দুইভাগে করা হয়। হাতের মধ্যে বিভিন্ন এলার্জেন দিয়ে পিক পিক করে টেস্ট করি। টেস্ট করার পর ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর আমরা বলে দিতে পারি তার কিসে কিসে অ্যালার্জি।

তা ছাড়া স্পেসিফিক আইজি বলে একটি বিষয় আছে। শরীর থেকে রক্ত নিয়ে মেশিনের মধ্যে দিয়ে দেখি কিসে অ্যালার্জি আছে। এটা সাধারণত আমরা বাচ্চাদের ক্ষেত্রে করি। তার পিক নিতে ভয় পায় দেখে সাধারণত করে থাকি।

অ্যালার্জি টেস্ট করার পর উৎসটাকে যদি বাদ দিয়ে দেই, তাহলে অ্যালার্জি হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম থাকে।

অ্যান্টি আইজি ওমালিজমাফ একটি ইনজেকশন আছে, সেখানেও আইজিকে কমানো যায়। এই দুটো করা হলে আইজির পরিমাণ কমবে। অ্যালার্জির পরিমাণ কমবে।

আর যে প্রদাহগুলো হবে সেগুলোতে স্টেরয়েড, মন্টিলুকাস, অ্যান্টি হিসটামিন- এগুলো ওষুধ দিয়ে ঠিক করা যায়। (যে কোনো ওষুধ ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।) আর অ্যাজমার অন্যতম একটি কারণ মানসিক চাপ। এদের যতই্ ওষুধ দেওয়া হয় কোনো কাজ হবে না, যদি মানসিক চাপ কমানো না হয়। এজন্য আমাদের দরকার যোগব্যায়াম, প্রাণায়েম, মেডিটেশন, শিথিল হওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি। এগুলো করলে এই ধরনের অ্যালার্জি জনিত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদি ভালো থাকা সম্ভব।

প্রশ্ন : অ্যালার্জির জন্য যেই পরীক্ষা করা দরকার এগুলো কী বাংলাদেশে সম্ভব?

উত্তর : সব পরীক্ষাই বাংলাদেশে সম্ভব। অনেকের ধারণা বাংলাদেশে অ্যালার্জির কোনো চিকিৎসা নেই। সব চিকিৎসা বিদেশে রয়েছে। জানা দরকার, অ্যালার্জির কেন হচ্ছে সেটি নির্ণয় করে চিকিৎসা নিলে ভালো থাকা সম্ভব। আর সব ধরনের পরীক্ষা এবং চিকিৎসা এখন বাংলাদেশেই আছে। এজন্য বিদেশে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

প্রশ্ন : অ্যালার্জির সঙ্গে তাপমাত্রার সম্পর্ক কী? কারো দেখা যায়, ঠান্ডা বা গরমে অ্যালার্জি হচ্ছে, কারো বৃষ্টির পানিতে ভিজলে অ্যালার্জি হচ্ছে। এই বিষয়টি কী?

উত্তর : ঠান্ডা-গরম হলে নাকের রিসেপটরগুলো ঠিক মতো গ্রহণ করতে পারে না। তখন নার্ভাস পদ্ধতির হরমোনের ভারসাম্য কমে গিয়ে এই সমস্যা হয়।

প্রশ্ন : অ্যালার্জি প্রতিরোধের উপায় কী? বিশেষ করে ভ্যাকসিন বা টিকার কোনো ভূমিকা আছে কি না?

উত্তর : অবশ্যই ভূমিকা আছে। আমি আগেই বলেছি, এর যদি সঠিক চিকিৎসা নেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদী ভালো থাকা যায়। রোগী এলে আমরা সাধারণত ইনহেলার বা একটি ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দেই। এটা করলে হবে না। প্রথম হলো যেই কারণে অ্যালার্জি হচ্ছে সেই ট্রিগার নির্ণয় করে সেটি পরিহার করতে হবে। ট্রিগার যদি পাওয়া যায় তাহলে আমাদের কষ্ট কম হবে। অ্যালার্জির ভ্যাকসিনও এখন বাংলাদেশে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এটি আছে, চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং রোগীও ভালো হচ্ছে।

অ্যালার্জি ভ্যাকসিনের কাজ হলো আমাদের শরীরে যে আইজিই বেশি থাকে, তার সমস্যা হয়। আইজিইকে যে আইজিজিতে রূপান্তর করে সেটাকে বলা হয় অ্যালার্জি ভ্যাকসিন। এখন অল্প মাত্রা থেকে আস্তে আস্তে একটি মাঝামাঝি ডোজে শরীরে দেওয়া হয়। দুইভাবে করা হয়, ইনজেকশনের মাধ্যমে এবং জিহ্বার নিচে দিয়ে। এর কাজ হলো আইজিইটাকে আইজিজিতে পরিণত করে। তখন আর কষ্ট হয় না।

প্রশ্ন : ভ্যাকসিন নেওয়ার ক্ষেত্রে কী কোনো পরীক্ষা করতে হয়?

উত্তর : এক্ষেত্রে অ্যালার্জি টেস্ট বা আইজিই পরীক্ষা করে নিতে হয়। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সে এটি শুরু করা যায়।

আপনি আরেকটি বিষয় দেখবেন আমাদের অনেকেরই হাঁচি হয়। দীর্ঘদিন সমস্যাটি থাকে। আমরা একে কোনো গুরুত্ব দেই না। হাঁচির পর অ্যাজমা হওয়ার আশঙ্কা ৯০ ভাগ। এই হাঁচির চিকিৎসা করতে হবে। তাহলে অ্যালার্জি হওয়ার আশঙ্কা অনেক কমে যাবে।

প্রশ্ন : অ্যালার্জি ভ্যাকসিন কি জীবনের যেকোনো সময় নেওয়া যায়?

উত্তর : অ্যালার্জি পরীক্ষা করার পর যার যে কারণে সমস্যাটি হয়, সেই কারণে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। রোগী চিকিৎসকের কাছে এলে পরীক্ষা করে ট্রিগারটি নির্ণয় করলে চিকিৎসা শুরু করা হয়। এটি সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি দিনও দেওয়া হয়। দিলে আইজিইর মাত্রা কমে গেলে সারা জীবনের জন্য সে সুস্থ থাকবে।